পরিবেশের জন্য ভাবনা (পার্ট-০১)
১. বায়ুমণ্ডল (Atmosphere)
ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকে প্রায় ১০,০০০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত যে অদৃশ্য গ্যাসীয় আবরণ পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে এবং পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের টানে পৃথিবীর গায়ে লেগে আছে, তাকে বায়ুমণ্ডল বলে।
- বায়ুমণ্ডলের মোট ভরের প্রায় ৯৭% থাকে ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৯ কিমি উচ্চতার মধ্যে।
২. বায়ুমণ্ডলের উপাদান
বায়ুমণ্ডলের শুষ্ক বাতাসে বিভিন্ন গ্যাসের আয়তনভিত্তিক শতাংশ নিচে দেওয়া হলো:
| উপাদান | রাসায়নিক সংকেত | শতকরা হার (%) |
|---|---|---|
| নাইট্রোজেন | $N_2$ | ৭৮.০৯% |
| অক্সিজেন | $O_2$ | ২০.৯৫% |
| আর্গন | $Ar$ | ০.৯৩% |
| কার্বন ডাই-অক্সাইড | $CO_2$ | ০.০৪% |
অন্যান্য: হিলিয়াম, মিথেন ($CH_4$), ওজোন ($O_3$) এবং জলীয় বাষ্প।
(এখানে উপাদানের পাই চার্ট বসবে)
৩. বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস (বিস্তারিত)
উষ্ণতা ও উচ্চতার ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলকে ৬টি স্তরে ভাগ করা যায়। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
(এখানে বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাসের উলম্ব চিত্র বসবে)
(ক) ট্রপোস্ফিয়ার (Troposphere) – ক্ষুব্ধমণ্ডল
অবস্থান: ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন সবচেয়ে নিচের স্তর। এর উচ্চতা নিরক্ষীয় অঞ্চলে ১৬-১৮ কিমি এবং মেরু অঞ্চলে ৮ কিমি।
বৈশিষ্ট্য:
- i) গ্যাসীয় ভর: বায়ুমণ্ডলের মোট ভরের ৭৫% এই স্তরেই থাকে।
- ii) আবহাওয়া: ধূলিকণা ও জলীয় বাষ্প থাকায় এখানে মেঘ, ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত হয়। তাই একে ক্ষুব্ধমণ্ডল বলে।
- iii) ল্যাপস রেট: উচ্চতা বাড়লে উষ্ণতা কমে। প্রতি ১ কিমি উচ্চতায় তাপমাত্রা $6.5^\circ C$ হারে কমে।
- iv) সর্বনিম্ন উষ্ণতা: এই স্তরের ঊর্ধ্বসীমায় তাপমাত্রা কমে প্রায় $-56^\circ C$ হয়।
🔴 ট্রপোপজ: ট্রপোস্ফিয়ার ও স্ট্রাটোস্ফিয়ারের সংযোগস্থল যেখানে তাপমাত্রা স্থির থাকে।
(খ) স্ট্রাটোস্ফিয়ার (Stratosphere) – শান্তমণ্ডল
অবস্থান: ট্রপোপজের ওপর থেকে প্রায় ৫০ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত।
বৈশিষ্ট্য:
- i) শান্ত পরিবেশ: মেঘ বা ঝড়-বৃষ্টি না থাকায় একে শান্তমণ্ডল বলে। এখান দিয়েই জেট বিমান চলাচল করে।
- ii) ওজোন স্তর: ২০-৩০ কিমি উচ্চতায় ওজোন গ্যাসের ($O_3$) স্তর থাকে, যা সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি (UV Ray) শোষণ করে।
- iii) উষ্ণতা বৃদ্ধি: ওজোন গ্যাস তাপ শোষণ করে বলে এখানে উচ্চতা বাড়লে তাপমাত্রা বাড়ে এবং $0^\circ C$ -এ পৌঁছায়।
🔴 স্ট্রাটোপজ: স্ট্রাটোস্ফিয়ার ও মেসোস্ফিয়ারের সংযোগস্থল।
(গ) মেসোস্ফিয়ার (Mesosphere)
অবস্থান: স্ট্রাটোপজের ওপর থেকে প্রায় ৮০ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত।
বৈশিষ্ট্য:
- i) উষ্ণতা হ্রাস: এই স্তরে উচ্চতা বাড়লে তাপমাত্রা দ্রুত কমতে থাকে।
- ii) শীতলতম স্তর: ৮০ কিমি উচ্চতায় তাপমাত্রা কমে প্রায় $-93^\circ C$ হয়। এটি বায়ুমণ্ডলের শীতলতম অঞ্চল।
- iii) উল্কাপাত: মহাকাশ থেকে আসা উল্কাপিণ্ড এই স্তরে প্রবেশ করলে বাতাসের ঘর্ষণে জ্বলে ছাই হয়ে যায়।
(ঘ) থার্মোস্ফিয়ার (Thermosphere) / আয়নোস্ফিয়ার
অবস্থান: মেসোপজের ওপর থেকে প্রায় ৫০০ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত।
বৈশিষ্ট্য:
- i) উষ্ণতা বৃদ্ধি: সূর্যরশ্মি শোষণের ফলে এখানে তাপমাত্রা খুব দ্রুত বেড়ে প্রায় $1200^\circ C$ হয়।
- ii) আয়নিত অবস্থা: উচ্চ তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অণুগুলি ভেঙে $H^+, He^+$ আয়নে পরিণত হয়।
- iii) বেতার তরঙ্গ: পৃথিবী থেকে পাঠানো বেতার তরঙ্গ (Radio Wave) এই স্তরে প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে, ফলে আমরা রেডিও শুনতে পাই।
- iv) মেরুজ্যোতি: এই স্তরে মেরুপ্রদেশে অরোরা বা মেরুজ্যোতি (Aurora) দেখা যায়।
(ঙ) এক্সোস্ফিয়ার (Exosphere)
অবস্থান: ৫০০ কিমি থেকে প্রায় ৭৫০ কিমি বা তার বেশি।
বৈশিষ্ট্য:
- i) গ্যাসের ঘনত্ব: এখানে বাতাস অত্যন্ত হালকা।
- ii) উপাদান: মূলত হালকা গ্যাস যেমন— হাইড্রোজেন ($H_2$) ও হিলিয়াম ($He$) এখানে ভেসে বেড়ায়।
- iii) কৃত্রিম উপগ্রহ: কৃত্রিম উপগ্রহ (Satellites) এই স্তরে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে।
(চ) ম্যাগনেটোস্ফিয়ার (Magnetosphere)
অবস্থান: এক্সোস্ফিয়ারের ওপর থেকে অসীম মহাকাশ পর্যন্ত।
বৈশিষ্ট্য:
- i) চৌম্বক ক্ষেত্র: এটি পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র দ্বারা বেষ্টিত অঞ্চল।
- ii) ভ্যান অ্যালেন বলয়: এখানে প্রোটন ও ইলেকট্রন কণাগুলি বলয়াকারে অবস্থান করে।
- iii) রক্ষা কবচ: এই স্তর সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকারক সৌরঝড় (Solar Wind) থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে।
৪. বৈজ্ঞানিক কারণ ও ব্যাখ্যা
প্রশ্ন: উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে উষ্ণতা হ্রাস পাওয়ার কারণ কী?
বায়ুমণ্ডল সূর্যের তাপে সরাসরি গরম হয় না। সূর্যরশ্মি প্রথমে ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে (Short wave)। এরপর ভূপৃষ্ঠ দীর্ঘ তরঙ্গ (Long wave) রূপে তাপ বিকিরণ করে নিচের বাতাসকে গরম করে। তাই ভূপৃষ্ঠের কাছের বাতাস সবচেয়ে উষ্ণ। উচ্চতা বাড়লে তাপের উৎস থেকে দূরত্ব বাড়ে এবং বাতাসের ঘনত্ব কমে যায়, ফলে তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে।
প্রশ্ন: উঁচু পর্বতের চূড়ায় সারাবছর বরফ থাকে কেন?
ট্রপোস্ফিয়ারে প্রতি ১০০০ মিটার বা ১ কিমি উচ্চতা বৃদ্ধিতে তাপমাত্রা $6.5^\circ C$ করে কমে যায়। এই নিয়মে হিমালয় বা অন্যান্য উঁচু পর্বতের চূড়ায় তাপমাত্রা কমতে কমতে হিমাঙ্কের ($0^\circ C$) নিচে চলে যায়। তাই সেখানে বরফ গলে না।
প্রশ্ন: ঝড় কেন সৃষ্টি হয়?
কোনো স্থানের বাতাস সূর্যের তাপে অত্যধিক গরম হয়ে হালকা হয়ে উপরে উঠে গেলে সেখানে গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। তখন আশেপাশের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে বাতাস প্রচণ্ড গতিতে ওই শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য ছুটে আসে। বাতাসের এই প্রবল প্রবাহকেই ঝড় বলে।
(এখানে সমুদ্র বায়ু ও স্থল বায়ুর ডায়াগ্রাম বসবে)
- ❄️ বায়ুমণ্ডলের শীতলতম স্তর: মেসোস্ফিয়ার (প্রায় $-93^\circ C$)।
- 🔥 বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতম স্তর: এক্সোস্ফিয়ার (তাপমাত্রা $1200^\circ C$ এর বেশি)।
- 📉 ল্যাপস রেট (Lapse Rate): ট্রপোস্ফিয়ারে প্রতি ১ কিমি উচ্চতায় তাপমাত্রা $6.5^\circ C$ কমে।
- 🛡️ ওজোন ছাতা: স্ট্রাটোস্ফিয়ার স্তরে দেখা যায়।
- 📡 বেতার তরঙ্গ প্রতিফলক: আয়নোস্ফিয়ার (থার্মোস্ফিয়ার)।
- ✈️ জেট বিমান চলাচলের পথ: স্ট্রাটোস্ফিয়ার (শান্তমণ্ডল)।
পরিবেশের জন্য ভাবনা (পার্ট-০২)
৫. ওজোন স্তরের সৃষ্টি (Formation of Ozone Layer)
স্ট্রাটোস্ফিয়ার স্তরে (২০-৩০ কিমি উচ্চতায়) সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির (UV Ray) প্রভাবে অক্সিজেন অণুর আলোক-রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ওজোন গ্যাস সৃষ্টি হয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
বিক্রিয়ার ধাপসমূহ:
- ধাপ ১: প্রথমে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ($UV$) অক্সিজেন অণু ($O_2$) কে ভেঙে দুটি সক্রিয় অক্সিজেন পরমাণুতে ($O$) পরিণত করে।
$$O_2 \xrightarrow{UV \ (h\nu)} O + O$$ - ধাপ ২: এই সক্রিয় অক্সিজেন পরমাণু ($O$) অন্য একটি অক্সিজেন অণুর ($O_2$) সাথে যুক্ত হয়ে ওজোন অণু ($O_3$) গঠন করে।
$$O_2 + O \rightarrow O_3 \ (\text{ওজোন})$$
(এখানে অক্সিজেন থেকে ওজোন তৈরির চিত্র বসবে)
৬. ওজোন স্তরের একক ও গুরুত্ব
- ঘনত্ব মাপার একক: ওজোন স্তরের ঘনত্ব বা পুরুত্ব মাপার এককের নাম ডবসন একক বা DU (Dobson Unit)। স্বাভাবিক অবস্থায় এটি ২০০-৩০০ DU হওয়া উচিত।
- ওজোন স্তরের গুরুত্ব:
- i) প্রাকৃতিক সৌরপর্দা: এটি সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি (UV-B, UV-C) শোষণ করে পৃথিবীকে ছাতার মতো রক্ষা করে।
- ii) উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ: স্ট্রাটোস্ফিয়ারের উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
৭. ওজোন হোল (Ozone Hole) কী?
মানুষের সৃষ্ট দূষণের ফলে স্ট্রাটোস্ফিয়ারের ওজোন স্তরের ঘনত্ব কমে পাতলা হয়ে যাওয়াকে ওজোন গহ্বর বা ওজোন হোল বলে।
- ১৯৮০-র দশকে বিজ্ঞানী জো ফোরম্যান প্রথম আন্টার্কটিকা মহাদেশের আকাশে ওজোন গহ্বর লক্ষ্য করেন।
- ওজোনের ঘনত্ব ২০০ DU এর নিচে নেমে গেলে তাকে ওজোন হোল বলা হয়।
৮. ওজোন ধ্বংসে CFC-এর ভূমিকা (বিস্তারিত)
ক্লোরোফ্লোরো কার্বন (CFC) বা ফ্রেয়ন ওজোন স্তর ধ্বংসের প্রধান কারণ। রেফ্রিজারেটর, এসি, স্প্রে ক্যান থেকে এটি নির্গত হয়। স্ট্রাটোস্ফিয়ারে পৌঁছে এটি চেইন রিঅ্যাকশন বা শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু করে।
ধ্বংসের রাসায়নিক সমীকরণ:
- ধাপ ১ (সক্রিয় ক্লোরিন গঠন): অতিবেগুনি রশ্মির (UV) আঘাতে CFC অণু ভেঙে অত্যন্ত সক্রিয় ক্লোরিন পরমাণু ($\dot{Cl}$) তৈরি করে।
$$CFCl_3 \xrightarrow{UV} CFCl_2 + \dot{Cl} \ (\text{সক্রিয় ক্লোরিন})$$ - ধাপ ২ (ওজোন বিনাশ): এই সক্রিয় ক্লোরিন ($\dot{Cl}$) ওজোনের ($O_3$) সাথে বিক্রিয়া করে ওজোনকে ভেঙে অক্সিজেন ($O_2$) ও ক্লোরিন মনোক্সাইড ($ClO$) তৈরি করে।
$$\dot{Cl} + O_3 \rightarrow ClO + O_2$$ - ধাপ ৩ (পুনরুৎপাদন ও পুনরাবৃত্তি): উৎপন্ন $ClO$ আবার ওজোন স্তরের মুক্ত অক্সিজেন পরমাণুর ($O$) সাথে বিক্রিয়া করে নতুন ক্লোরিন পরমাণু ($\dot{Cl}$) মুক্ত করে।
$$ClO + O \rightarrow \dot{Cl} + O_2$$
🔴 ভয়াবহতা: ওপরের ধাপ ৩-এ উৎপন্ন ক্লোরিন ($\dot{Cl}$) আবার ধাপ ২-এর মতো নতুন ওজোন অণুকে ভাঙতে শুরু করে। এভাবে একটি সক্রিয় ক্লোরিন পরমাণু প্রায় ১ লক্ষ ওজোন অণুকে ধ্বংস করতে পারে।
(CFC দ্বারা ওজোন ধ্বংসের চক্রাকার চিত্র)
৯. নাইট্রোজেন অক্সাইডসমূহের ভূমিকা
স্ট্রাটোস্ফিয়ারের মধ্য দিয়ে চলাচলকারী সুপারসনিক জেট বিমান থেকে নির্গত নাইট্রিক অক্সাইড ($NO$) ওজোন ধ্বংস করে।
সমীকরণ:
- নাইট্রিক অক্সাইড ($NO$) ওজোনের সাথে বিক্রিয়া করে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ($NO_2$) ও অক্সিজেন তৈরি করে।
$$NO + O_3 \rightarrow NO_2 + O_2$$ - উৎপন্ন $NO_2$ আবার ওজোনের সাথে বিক্রিয়া করতে পারে।
$$NO_2 + O_3 \rightarrow NO_3 + O_2$$
১০. ওজোন ক্ষয়ের প্রভাব (Impacts)
ওজোন স্তর পাতলা হলে অতিবেগুনি রশ্মি (UV) সরাসরি পৃথিবীতে চলে আসে। এর প্রভাবগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
(ক) মানব শরীরের ওপর প্রভাব:
- i) চামড়ার ক্যান্সার: মেলানোমা বা স্কিন ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
- ii) চোখের ক্ষতি: চোখে ছানি (Cataract) পড়ে এবং কর্নিয়ার ক্ষতি হয়, যা অন্ধত্ব ডেকে আনতে পারে।
- iii) ইমিউনিটি হ্রাস: মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
- iv) ডিএনএ পরিবর্তন: জীবকোষের DNA-র গঠন পরিবর্তন (Mutation) হতে পারে।
(খ) পরিবেশের ওপর প্রভাব:
- i) সালোকসংশ্লেষ ব্যাহত: উদ্ভিদের পাতা বিবর্ণ হয় এবং ক্লোরোফিল নষ্ট হয়ে যায়, ফলে সালোকসংশ্লেষ ও শস্য উৎপাদন কমে যায়।
- ii) সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র: সমুদ্রের জলের ওপরের স্তরে থাকা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন (মাছের প্রধান খাদ্য) অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে মারা যায়। ফলে পুরো সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে।
- iii) জলবায়ু পরিবর্তন: বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন ত্বরান্বিত হয়।
১১. মন্ট্রিল প্রটোকল (Montreal Protocol)
ওজোন স্তর ক্ষয় রোধ করার জন্য ১৯৮৭ সালে কানাডার মন্ট্রিল শহরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা মন্ট্রিল প্রোটোকল নামে পরিচিত।
- উদ্দেশ্য: ওজোন ধ্বংসকারী পদার্থ বিশেষ করে CFC এবং হ্যালন (Halons)-এর উৎপাদন ও ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনা।
- ফলাফল: এটি পৃথিবীর অন্যতম সফল পরিবেশ চুক্তি। বর্তমানে ওজোন হোল ধীরে ধীরে সেরে উঠছে।
পরিবেশের জন্য ভাবনা (পার্ট-০৩)
১২. গ্রিন হাউস এফেক্ট (Greenhouse Effect)
শীতপ্রধান দেশে কাঁচের ঘরের ভেতর তাপমাত্রা বাইরের তুলনায় বেশি থাকে, একে গ্রিন হাউস বলে। ঠিক একইভাবে, বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত কিছু গ্যাস পৃথিবীকে একটি কাঁচের ঘরের মতো আবৃত করে রাখে।
সংজ্ঞা: সূর্য থেকে আসা ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রশ্মি বায়ুমণ্ডল ভেদ করে পৃথিবীতে আসে এবং পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে। কিন্তু পৃথিবী থেকে বিকিরিত দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তাপীয় রশ্মি (Infrared) বায়ুমণ্ডলে থাকা গ্যাসগুলি দ্বারা শোষিত হয় এবং মহাকাশে ফিরে যেতে পারে না। ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত থাকে। এই ঘটনাকে গ্রিন হাউস এফেক্ট বলে।
(এখানে গ্রিন হাউস এফেক্টের কার্যপদ্ধতির ছবি বসবে: সূর্যরশ্মি ঢুকছে কিন্তু তাপ বের হতে পারছে না)
১৩. গ্রিন হাউস গ্যাস (Greenhouse Gases)
সংজ্ঞা: বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত যে সমস্ত গ্যাসীয় উপাদান পৃথিবী থেকে বিকিরিত দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তাপ (অবলোহিত রশ্মি) শোষণ করে বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে, তাদের গ্রিন হাউস গ্যাস (GHG) বলে।
বিভিন্ন প্রকার গ্রিন হাউস গ্যাসের নাম ও সংকেত:
| গ্যাসের নাম | রাসায়নিক সংকেত | উষ্ণায়নে অবদান |
|---|---|---|
| কার্বন ডাই-অক্সাইড | $CO_2$ | ৫০% (প্রধান গ্যাস) |
| মিথেন | $CH_4$ | ১৯% |
| ক্লোরোফ্লোরো কার্বন | $CFC$ | ১৬% |
| ওজোন | $O_3$ | ৮% |
| নাইট্রাস অক্সাইড | $N_2O$ | ৫% |
| জলীয় বাষ্প | $H_2O$ (vapor) | পরিবর্তনশীল |
🔴 সতর্কতা: অক্সিজেন ($O_2$) এবং নাইট্রোজেন ($N_2$) গ্রিন হাউস গ্যাস নয়।
১৪. বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming)
সংজ্ঞা: জীবাশ্ম জ্বালানির অত্যধিক ব্যবহার ও বনভূমি ধ্বংসের কারণে বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউস গ্যাসগুলির ($CO_2, CH_4$ ইত্যাদি) পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে সারা পৃথিবী জুড়ে বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনাকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়ন বলে।
১৫. বিশ্ব উষ্ণায়ন ও গ্রিন হাউস এফেক্টের ফলাফল
পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার ফলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে:
- i) বরফ গলন ও জলতল বৃদ্ধি: মেরু অঞ্চলের বরফ এবং হিমবাহ গলে যাচ্ছে। ফলে সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও ভারতের সুন্দরবনের মতো নিচু উপকূলীয় এলাকাগুলি ভবিষ্যতে জলের তলায় তলিয়ে যেতে পারে।
- ii) আবহাওয়ার পরিবর্তন: ঋতুচক্রের পরিবর্তন হচ্ছে। কোথাও খরা, আবার কোথাও বিধ্বংসী বন্যা দেখা দিচ্ছে। 'সুপার সাইক্লোন' বা ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ ও তীব্রতা বাড়ছে।
- iii) রোগের প্রাদুর্ভাব: তাপমাত্রা বাড়ার ফলে মশা ও মাছি বাহিত রোগ (যেমন— ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, এনসেফালাইটিস) দ্রুত ছড়াচ্ছে।
- iv) বাস্তুতন্ত্রের বিনাশ: সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ার ফলে প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল রিফ (Coral Reef) ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, একে 'কোরাল ব্লিচিং' বলে। অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হচ্ছে।
- v) কৃষি উৎপাদন হ্রাস: আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় ফসলের ক্ষতি হচ্ছে এবং খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।
১৬. বিশ্ব উষ্ণায়ন কমানোর উপায় (Remedies)
- i) জীবাশ্ম জ্বালানি হ্রাস: কয়লা, পেট্রোল ও ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে।
- ii) বিকল্প শক্তির ব্যবহার: পরিবেশবান্ধব বা অপ্রচলিত শক্তি যেমন— সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জোয়ার-ভাটা শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
- iii) বনসৃজন: নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণে নতুন গাছ লাগাতে হবে। কারণ গাছ বাতাস থেকে $CO_2$ শোষণ করে।
- iv) CFC বর্জন: রেফ্রিজারেটর ও এসি মেশিনে CFC-র বদলে পরিবেশবান্ধব হাইড্রোকার্বন ব্যবহার করতে হবে।
(এখানে বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব সম্পর্কিত একটি চার্ট বসবে)
১৭. কিওটো প্রটোকল (Kyoto Protocol)
বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধ করার জন্য ১৯৯৭ সালে জাপানের কিওটো শহরে বিভিন্ন দেশের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা কিওটো প্রটোকল নামে পরিচিত।
- উদ্দেশ্য: এই চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউস গ্যাস (বিশেষ করে $CO_2$) নির্গমন কমানো।
- মেয়াদ: এটি ২০০৫ সাল থেকে কার্যকর হয়।