গুপ্ত সাম্রাজ্য (পর্ব-১)
WB SSC Special | উৎস, উৎপত্তি ও সমুদ্রগুপ্ত
ভূমিকা: কুষাণ সাম্রাজ্যের পতনের পর মগধকে কেন্দ্র করে আবার এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে, যা 'গুপ্ত সাম্রাজ্য' নামে পরিচিত। এই যুগে ভারত জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলায় বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। এই পর্বে গুপ্তদের উৎপত্তি, প্রথম চন্দ্রগুপ্ত এবং সমুদ্রগুপ্তের দিগ্বিজয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।
ক) ইতিহাসের উপাদান ও উৎপত্তি
১. গুপ্ত ইতিহাসের প্রধান সাহিত্যিক উপাদান কী?
বিশাখদত্তের 'দেবীচন্দ্রগুপ্তম', কালিদাসের কাব্যসমূহ এবং ফা-হিয়েনের বিবরণ।
২. 'দেবীচন্দ্রগুপ্তম' নাটকটি কে রচনা করেন?
বিশাখদত্ত।
৩. 'মৃচ্ছকটিক' নাটকটি কার লেখা?
শূদ্রক (গুপ্ত আমলের সামাজিক চিত্র পাওয়া যায়)।
৪. 'কামসূত্র' কে রচনা করেন?
বাৎস্যায়ন (গুপ্ত যুগে নাগরিক জীবনের বিবরণ দেয়)।
৫. 'নীতিসার' কে রচনা করেন?
কামন্দক (একে গুপ্ত যুগের অর্থশাস্ত্র বলা হয়)।
৬. গুপ্ত ইতিহাসের প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান কী?
এলাহাবাদ প্রশস্তি, মেহরৌলি লৌহস্তম্ভ লিপি এবং ভিতরগাঁও লিপি।
৭. ফা-হিয়েন কার রাজত্বকালে ভারতে আসেন?
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে।
৮. ফা-হিয়েনের লেখা গ্রন্থটির নাম কী?
ফো-কুও-কি (Fo-Kwo-Ki)।
৯. গুপ্ত রাজাদের উৎপত্তি সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মত কী?
মতভেদ আছে। কেউ বলেন তাঁরা বৈশ্য (রোমিলা থাপার), কেউ বলেন ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়।
১০. গুপ্তরা সম্ভবত কাদের সামন্ত ছিলেন?
কুষাণদের (প্রয়াগ বা সাকেত অঞ্চলের)।
১১. গুপ্ত মুদ্রার ভাণ্ডার কোথায় আবিষ্কৃত হয়েছে?
রাজস্থানের বায়ানাতে (Bayana Hoard)।
খ) প্রাথমিক শাসকগণ (শ্রীগুপ্ত ও ঘটোৎকচ)
১২. গুপ্ত বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে?
শ্রীগুপ্ত (Srigupta) - আনুমানিক ২৭৫ খ্রিস্টাব্দে।
১৩. শ্রীগুপ্তের উপাধি কী ছিল?
মহারাজ (এটি সামন্ত রাজাদের উপাধি ছিল)।
১৪. চীনা পর্যটক ইৎ-সিং (I-tsing) শ্রীগুপ্তকে কী নামে উল্লেখ করেছেন?
চে-লি-কি-তো (Che-li-ki-to)।
১৫. শ্রীগুপ্ত কোথায় চিনা ভিক্ষুদের জন্য মন্দির নির্মাণ করেছিলেন?
মৃগশিখাবনে (সারনাথের কাছে)।
১৬. শ্রীগুপ্তের পর কে রাজা হন?
ঘটোৎকচ গুপ্ত (Ghatotkacha)।
১৭. ঘটোৎকচের উপাধি কী ছিল?
মহারাজ।
গ) প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (Chandragupta I) - ৩২০ থেকে ৩৩৫ খ্রি:
১৮. গুপ্ত বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কাকে বলা হয়?
প্রথম চন্দ্রগুপ্তকে।
১৯. প্রথম চন্দ্রগুপ্ত কবে সিংহাসনে বসেন?
৩২০ খ্রিস্টাব্দে।
২০. প্রথম চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসন আরোহণের বছর থেকে কোন অব্দ চালু হয়?
গুপ্তাব্দ (Gupta Era - ৩১৯-৩২০ খ্রি:)।
২১. প্রথম চন্দ্রগুপ্তের উপাধি কী ছিল?
মহারাজাধিরাজ (স্বাধীন ও সার্বভৌম সম্রাট)।
২২. প্রথম চন্দ্রগুপ্ত কোন রাজবংশের কন্যার সাথে বিবাহ করেন?
লিচ্ছবি বংশের রাজকন্যা কুমারদেবীকে।
২৩. এই বিবাহের ফলে তিনি কোন রাজ্য যৌতুক পান?
বৈশালী ও পাটলিপুত্র অঞ্চল (মগধের শক্তি বৃদ্ধি পায়)।
২৪. প্রথম চন্দ্রগুপ্ত কোন বিশেষ স্বর্ণমুদ্রা চালু করেন?
রাজা-রানী বা বিবাহ রীতির মুদ্রা (King-Queen Type Coin)।
২৫. মুদ্রার একপিঠে কার নাম খোদাই করা ছিল?
চন্দ্রগুপ্ত ও কুমারদেবী এবং অপর পিঠে 'লিচ্ছবয়ঃ' (Lichchhavayah)।
২৬. প্রথম চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী কোথায় ছিল?
পাটলিপুত্র।
ঘ) সমুদ্রগুপ্ত (Samudragupta) - ৩৩৫ থেকে ৩৮০ খ্রি:
২৭. প্রথম চন্দ্রগুপ্তের পর কে সিংহাসনে বসেন?
সমুদ্রগুপ্ত (তাঁর পুত্র)।
২৮. সমুদ্রগুপ্ত নিজেকে কী বলে পরিচয় দিতেন?
লিচ্ছবি দৌহিত্র (Lichchhavi Dauhitra - লিচ্ছবিদের নাতি)।
২৯. সমুদ্রগুপ্তের দিগ্বিজয় সম্পর্কে জানার প্রধান উৎস কী?
এলাহাবাদ প্রশস্তি বা প্রয়াগ প্রশস্তি।
৩০. এলাহাবাদ প্রশস্তি কে রচনা করেন?
হরিষেণ (Harisena - সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি ও সন্ধিবিগ্রহিক)।
৩১. এলাহাবাদ প্রশস্তি কোন ভাষায় রচিত?
সংস্কৃত ভাষায় (চম্পু বা গদ্য-পদ্য মিশ্রিত শৈলীতে)।
৩২. এই প্রশস্তিটি কোন স্তম্ভে খোদাই করা আছে?
অশোকের এলাহাবাদ স্তম্ভে।
৩৩. সমুদ্রগুপ্তকে 'ভারতের নেপোলিয়ন' কে বলেছেন?
ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ (Vincent Smith)।
৩৪. কেন তাঁকে 'ভারতের নেপোলিয়ন' বলা হয়?
তাঁর অসামান্য সামরিক দক্ষতা এবং ভারতব্যাপী সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য।
৩৫. সমুদ্রগুপ্ত উত্তর ভারতের কয়টি রাজ্য জয় করেন?
৯টি রাজ্য (আর্যাবর্ত অভিযান)।
৩৬. উত্তর ভারত জয়ের ক্ষেত্রে তিনি কোন নীতি গ্রহণ করেন?
দিগ্বিজয় বা উচ্ছেদ নীতি (সরাসরি সাম্রাজ্যভুক্ত করা)।
৩৭. সমুদ্রগুপ্ত দক্ষিণ ভারতের কয়টি রাজ্য জয় করেন?
১২টি রাজ্য (দক্ষিণাপথ অভিযান)।
৩৮. দক্ষিণ ভারত জয়ের ক্ষেত্রে তিনি কোন নীতি গ্রহণ করেন?
ধর্মবিজয় বা গ্রহণ-মোক্ষ-অনুগ্রহ নীতি (জয় করে, কর নিয়ে, মুক্তি দিয়ে অনুগ্রহ করা)।
৩৯. সমুদ্রগুপ্তের কাছে পরাজিত কাঞ্চির রাজা কে ছিলেন?
বিষ্ণুগোপ (পল্লব রাজা)।
৪০. আটবিক রাজ্যগুলি (Forest Tribes) কোথায় ছিল?
মধ্য ভারতের জঙ্গল অঞ্চলে (গাজিপুর থেকে জব্বলপুর)।
৪১. প্রত্যন্ত বা সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলি (যেমন- কামরূপ, নেপাল) তাঁর সাথে কেমন সম্পর্ক রাখত?
কর দিত এবং বশ্যতা স্বীকার করত (সর্ব-কর-দানাজ্ঞাকরণ)।
৪২. সমুদ্রগুপ্ত কী ধরনের যজ্ঞ করেছিলেন?
অশ্বমেধ যজ্ঞ (দিগ্বিজয়ের প্রতীক হিসেবে)।
৪৩. সমুদ্রগুপ্তের মুদ্রায় তাঁকে কী বাজাতে দেখা যায়?
বীণা (Veena)।
৪৪. এই মুদ্রা থেকে তাঁর কোন গুণের পরিচয় পাওয়া যায়?
তিনি সঙ্গীতপ্রেমী ছিলেন।
৪৫. সমুদ্রগুপ্তের উপাধিগুলি কী কী ছিল?
কবিরাজ (Kaviraja), পরাক্রমাঙ্ক (Parakramanka), সর্বরাজোচ্ছেত্তা (সকল রাজার উচ্ছেদকারী), অশ্বমেধ-পরাক্রম।
৪৬. সমুদ্রগুপ্ত কোন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন?
বসুবন্ধু (Vasubandhu)।
৪৭. শ্রীলঙ্কার কোন রাজা সমুদ্রগুপ্তের কাছে দূত পাঠিয়েছিলেন?
মেঘবর্মণ (Meghavarman)।
৪৮. মেঘবর্মণ কোথায় বৌদ্ধ মঠ নির্মাণের অনুমতি চেয়েছিলেন?
বোধগয়ায় (সমুদ্রগুপ্ত অনুমতি দিয়েছিলেন)।
৪৯. এলাহাবাদ প্রশস্তিতে সমুদ্রগুপ্তকে কার সাথে তুলনা করা হয়েছে?
কুবের (ধনদেবতা), বরুণ (জলদেবতা), ইন্দ্র ও যমের সাথে।
৫০. হরিষেণ তাঁর কোন পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন?
মহাসন্ধিবিগ্রহিক (যুদ্ধ ও শান্তি বিষয়ক মন্ত্রী), কুমারামাত্য এবং মহাদণ্ডনায়ক।
ঙ) রামগুপ্ত বিতর্ক (Ramagupta)
৫১. সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর কে সিংহাসনে বসেন বলে মনে করা হয়?
রামগুপ্ত (ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত)।
৫২. রামগুপ্তের কাহিনীর উল্লেখ কোথায় পাওয়া যায়?
বিশাখদত্তের 'দেবীচন্দ্রগুপ্তম' নাটকে।
৫৩. কাহিনী অনুযায়ী রামগুপ্ত কোন শক রাজার কাছে পরাজিত হন?
শক রাজা তৃতীয় রুদ্রসিংহের কাছে।
৫৪. রামগুপ্ত সন্ধি হিসেবে শক রাজার হাতে কাকে তুলে দিতে রাজি হন?
নিজের স্ত্রী ধ্রুবদেবীকে।
৫৫. ধ্রুবদেবীকে কে রক্ষা করেন?
রামগুপ্তের ছোট ভাই দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (ছদ্মবেশে গিয়ে শক রাজাকে হত্যা করেন)।
৫৬. পরে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত কাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন?
বড় ভাই রামগুপ্তকে।
৫৭. রামগুপ্তের অস্তিত্বের প্রমাণ কোথায় পাওয়া গেছে?
বিদিশার কাছে দুরজনপুর শিলালিপি এবং কিছু তামার মুদ্রায়।